মঙ্গলবার,২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং,১২ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ,



ইটালির ভাসমান শহর ভেনিসে একদিন


প্রবাস সংবাদ :
০৯.১২.২০১৯

মোঃ রাসেল আহম্মেদ, লিসবন পর্তুগাল :

একটি সময় ইউরোপের কথা শুনলেই প্রথমে ইটালির কথা মনে ভেসে আসতো। কেননা ইংল্যান্ডের পরে ইউরোপের কোন দেশে সবচেয়ে বেশী বাংলাদেশী রয়েছে এই দেশটিতেই। নিরাপদ ও সহজ অভিবাসন এবং সম্বৃদ্ধ অর্থনৈতিক অবস্থানের কারনে বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশি সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে ইটালির বিভিন্ন শহর।

আমার ঘুরে বেড়ানোর চরম নেশা সেই ছোট বেলা থেকেই তাই ইউরোপে বিগত চার বছরে প্রায় ১৫টি দেশের ৫০ এর অধিক শহর ভ্রমণ করার সৌভাগ্য হয়েছে। বিভিন্ন দেশে একাধিক বার ভিন্ন ভিন্ন শহরে আমার যাওয়া পড়েছে। ইটালিও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবছরের শুরুতে বিশ্বের প্রাচীনতম নগরী ইটালির রাজধানী রোম শহর ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। আর বছরের শেষে অন্য দুই শহর মিলান বানিজ্যিক নগরী এবং ভেনিস পর্যটন নগরী ভ্রমনের মাধ্যমে ষোলকলা পূর্ণ হল।

সাংবাদিকদের একটি সম্মেলনে যোগ দিতে আমরা পর্তুগাল থেকে ছয় জনের একটি টিম মিলান যাওয়ার পরিকল্পনা করি। এক পর্যায়ে সদস্যের সংখ্যা বেড়ে দশে পৌঁছালো। মিলান যাবো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কিন্তু আমরা ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা করি ভেনিসে। তাই পর্তুগালে থাকা অবস্থায় মিলান থেকে ভেনিসের ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করি। কিন্তু শেষ পর্যায়ে আমরা ছয় জন মিলান যাই এবং আমাদের মধ্যে পাঁচ জন ভেনিসে যাওয়ার চুড়ান্ত সিন্ধান্ত হয়।

বৃষ্টি ভেজা মিলানে দুদিন কাটিয়ে পরের দিন সকাল ৮ টার ট্রেনে করে আমরা মিলান সেন্টার স্টেশন থেকে ভেনিসে রওনা দিলাম। প্রথমে মাটির নিচের মেট্রোরেল দিয়ে আমরা মিলান ট্রেন স্টেশনে পৌঁছাই। ট্রেন স্টেশনটি বলতে গেলে ছবির মত করে সাজানো। বিশাল আকৃতির স্টেশনে ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে ইটালির বিভিন্ন শহর সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একের পর এক ট্রেন থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ট্রেন সময় মাফিক স্টেশনে আসছে এবং গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে। এক মিনিটের হেরফের হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

আমাদের ট্রেন দশ মিনিট আগে প্লাট ফ্রমে এসে পৌছায় এবং আমরা সকলে চট জলদি তাতে উঠে পড়ি। এর আগে স্টেশনে আমরা ইটালিয়ান কোরাসাও ও কাপাচিনো দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। মিলান থেকে ভেনিস প্রায় ২৭০ কিলোমিটার যা হাইস্পিড বুলেট ট্রেন দিয়ে দুই ঘন্টায় পাড়ি দিলাম। কিছু কিছু জায়গায় ট্রেনের গতি ডিজিটাল পর্দায় তিনশো কিলোমিটারের বেশী দেখাচ্ছিল। কিন্তু ভেতরে থেকে বুঝার কোন উপায় নেই এত প্রচন্ড গতিতে ট্রেন ছুটে চলছে।

জীবনে প্রথম বুলেট ট্রেনের অভিজ্ঞতা হলো ভেনিস ভ্রমনের মাধ্যমে। ট্রেন সরাসরি ভেনিসের কেন্দ্র পর্যন্ত ছুটে যায়। স্টেশন থেকে বের হলেই চোখে ধরা পড়বে ভেনিসের চিরচেনা সেই দৃশ্য! আঁকাবাঁকা বয়ে চলা অসংখ্য খাল যার উপরে ছোট ছোট নয়নাভিরাম ব্রিজ এবং প্রকৃতির খাল দিয়ে বয়ে চলছে হরেকরকমের নৌযান, লঞ্চ এবং পর্যটকের জন্য বিলাসবহুল প্রমোদ তরী। প্রথম দেখাতেই যেকারোই মন ভরে যাবে এসব নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে।

ভেনিসের গঠন মূলত শহরটিকে আলাদা করে তুলেছে যা শহরটিকে বিশ্বের সেরা সুন্দর শহরের তকমা দিয়েছে। একশ সতেরটি দীপপুঞ্জ নিয়ে এক হাজার পাঁচশ বছর আগে গড়ে উঠা শহরটিতে একশ পঞ্চাশটি বেশী খাল রয়েছে। যার উপর প্রায় চারশো টি ব্রিজ রয়েছে মানুষের চলাচলের জন্য। এসব কারনে শহরটি অন্য যেকোন শহরের তুলনায় আকর্ষনীয় যদিও এই অপূর্ব সুন্দর শহটি প্রতি একশ বছরে ৮ ইঞ্চি করে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে ভ্রমনার্থীদের নিকট অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠেছে এটি।

ভেনিস শহরটির একাধিক উপাধি রয়েছে তাই দীর্ঘদিন ধরে তা দেখার প্রবল আগ্রহ ছিল আমার কিন্তু আমার কাছে সকল উপাধি ছাড়িয়ে এক কথায় বলতে পারি স্রষ্টার নিদারুণ বিষ্ময়কর সৃষ্টি। জলের সঙ্গে মানুষের বসবাস! শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও এটিই এখানে বাস্তবতা। শুরুতে বিষয়টা কিছুটা অবাক মনে হলেও পরে অনুধাবন করি মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।

মানুষ সেই অরণ্যে থেকে হিমালয়, মরুভূমি থেকে উত্তর মেরু সব জায়গায় নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সাগর তীরে ভাসমান একটি শহরে হাজার বছর ধরে মানুষের বসবাস সত্যি অসাধ্য সাধন বটে। আর তাইতো এমন দৃশ্য দেখতে প্রতি বছর ভীর জমায় লক্ষ কোটি পর্যটক। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকষর্ণীয় এবং বিশ্ব ঐতিহ্য স্বীকৃত এই শহটি কোটি মানুষের পদচারণায় অন্যতম ব্যয়বহুল শহরের তকমা পেয়েছে ইতিমধ্যে।

এখানে পর্যটকদের জন্য ঘুরেবেড়ানোর বেশ কিছু স্থান রয়েছে। তাদের মধ্যে বেসিলিকা ডি সান মার্কো, ডোজের প্যালেস, ডরসডুরো, গন্ডোলা রাইড, রিয়াল্টো মার্কেট, যাদুঘর ও গির্জা ট্রেলিং, লা ফেনিস থিয়েটার, মুরানো, বুরানো এবং তুরসেলো দ্বীপপুঞ্জ এবং লিডো সী বিচ। মোটামুটি তিন দিনের ভ্রমনের পরিকল্পনা থাকলে সব স্থান পরিদর্শনের জন্য যথেষ্ট হবে। কিন্তু আমাদের মাত্র একদিনের সল্প সময়ের ট্যুর!

আমরা শহটির গভীরে গিয়ে অবলোকন করার লক্ষ্যে সারাদিনের জন্য ২০ ইউরো করে জন প্রতি একেকটি বোটের টিকিট সংগ্রহ করলাম। এই টিকিটের মাধ্যমে সারাদিন যতবার খুশি সব ধরনের যানবাহনে ভ্রমন করা যাবে। আমরা সেন্টার স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করলাম। গ্রান্ড ক্যানাল দিয়ে আমাদের বোট সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মূল খাল থেকে অসংখ্য ছোট বড় খাল বিভিন্ন দিকে বয়ে চলেছে। বোট থেকে দু’দিকে তাকালে দালান গুলোকে মনে হবে পানির উপর ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতি এবং আধুনিকতার এক চমৎকার মেলবন্ধনে তৈরিতে হয়েছে এই শহরটি।

মিলান থেকে ট্রেনে চড়ার আগে আমাদের একজনে সোসাল মিডিয়ায় জানান দিল আমরা ভেনিস আসছি। অনেকেই আমাদের কল এবং মেসেজ পাঠিয়েছে এক কাপ কফি খাওয়ার। ভেনিসে প্রচুরসংখ্যক বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছে যাদের বেশির ভাগ কাজ করছে জাহাজ নির্মান শিল্পে এবং টুরিজম সংশ্লিষ্ট খাতে। দেশীয় ভাইদের অতিথিপরায়ণতা দেখে খুবই মুগ্ধ হলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে অনেকের সাথে দেখা করা সম্ভব হয়নি।

সিনিয়র এক ভাই যিনি এক সময়ে পর্তুগাল ছিলেন বর্তমানে ভেনিসে ব্যবসা করছেন তার পিড়াপিড়িতে আমরা তৃতীয় স্টেশন মেনে তাহার আতিথিয়তা গ্রহণ করলাম। আমি সাধারণ কোথাও ভ্রমণে বের হলে সেখানকার স্থানীয় খাবার খেতে পছন্দ করি। আর ইটালিয়ান ফিজা বিশ্বের সেরা। অসংখ্য স্বাদের ফিজা পাওয়া যায় এখানে যা বিষন সুস্বাদু। তাই আমরা সকলে নিজেদের পছন্দ সই ফিজা এবং কফি খেলাম সেই ভাইটির সাথে দেখা করে।

তারপরে আরার অপেক্ষা পরবর্তী বোট ধরে সামনের অজানাকে জানা এবং অদেখাকে দেখার। খালের পাশের প্রতিটি বাড়ির সামনে রয়েছে হরেক রকমের নৌকা, বোট, স্পিড বোট সহ বিভিন্ন ধরনের জলযান। নিয়মিত লঞ্চ সেবার পাশাপাশি প্রত্যেকে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় এসব জালযানের ব্যবস্থা রেখেছেন তাদের নিত্যদিনের যাতায়াতের জন্য।

ভেনিসে সাধারণ এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে কারন এই সময়টাতে ইউরোপে সামার টাইম থাকে ফলে আবহাওয়া বেশ চমৎকার হয়। তাছাড়া এই সময়ে সামার ভেকেশনের ফলে স্কুল কলেজ বন্ধ থাকে এবং সকলে ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়েন। ভেনিসে প্রতি বছর প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ বেড়াতে যায় যেখানে শহরটিতে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা মাত্র ৫৫ লক্ষ যা দেশটির আয়ের বিশাল একটি খাত। আমরা যখন ভ্রমণে এলাম তখন আবহাওয়া বেশ খারাপ। মাত্র কয়েক দিন আগে এখানে প্রচন্ড জোয়ারের ফলে সমগ্র শহর পানির নিচে তলিয়ে যায়।

তাছাড়া এসময়ে শীতের পাশাপাশি প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হয়। ভেনিস সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক ফুট উপরে অবস্থান করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শহরের তালিকায় ভেনিসের অবস্থান সামনের দিকে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছেন আগামী কয়েক দশকের মধ্যে শহরটির অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা না হয়।

সারাদিনের ঘুরাঘুরি শেষে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমরা তাই সন্ধ্যা চারটায় দুপুরের খাবারের জন্য রেস্টুরেন্টে বসলাম সিটি সেন্টারে বাস স্টেশনে। দুটি ফিজা ও পাঁচটি থান্ডা পানিয় আমাদের বিল আসলো ৭০ ইউরো। আগেই বলেছিলাম শহরটি বেশ ব্যয়বহুল। আমাদের ফিরতি ফ্লাইট ছিল রাত আটটায় তাই খাবার শেষ করে বাসে চড়ে বসলাম। এখানে বলে রাখি সারাদিনের জন্য সংগ্রহ করা টিকেট এয়ারপোর্টের বাসে কাজ করে তাই জনপ্রতি বাড়তি ৬ ইউরো দিয়ে টিকিট করতে হয়নি। সিটি সেন্টার থেকে সরাসরি মিনিট বিশেকের দূরত্বে মার্কো পোলো বিমানবন্দর। এবার লিসবন, দ্বিতীয় বাড়িতে ফেরার ফালা!



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি